১৯৭১ সাল। রাত প্রায় চারটার কাছাকাছি। কিছুক্ষণের মধ্যে ফযরের
আজান পরবে। এই সময়টাতে মানুষের ঘুম কিছুটা হালকা থাকে। তারা নানান স্বপ্ন দেখে। সবার
স্বপ্ন এক রকম হয় না। বয়স এবং অবস্থা ভেদে তাদের স্বপ্নও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন বুড়োরা
দেখে তারা জোয়ান হয়ে গেছে, কিশোর বয়সের ছেলেরা দেখে কোন সুপার ন্যাচেরাল পাওয়ার
পেয়ে গেছে, তরুণরা দেখে সুন্দরী কোন তরুনীকে, কৃষকেরা দেখে স্বোনালী ধানের, মায়েরা
দেখে স্বোনার সংসার, বাবা দেখে চাকুরীর প্রমোশন, তরুনীরা দেখে তার বিয়ে হচ্ছে কোন
এক রাজপুত্রের সাথে, কিশোরীরা দেখে হেভী স্মার্ট কোন এক ছেলের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে
প্রেম করা এবং শিশুরা স্বপ্ন দেখে আর দাঁতহীন মাড়ি বের করে দেবতা শুলভ হাঁসি হাসে।
এমনই আজ রাত্রে আন্দারপারা গ্রামবাসী শান্তির ঘুমে মত্ত।
প্রকৃতির অনন্য দান ঘুম এবং ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন তাঁর বিশেষ উপহার। তবে আজ যেন
প্রকৃতি আন্দারপারাবাসীদের স্বর্গীয় উপহার থেকে বঞ্চিত করল।
কেউ ঘুম থেকে উঠল পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রী-কন্যার ডাকাডাকিতে, কেউ কেউ হয়তো মাত্র স্বপ্নে অংশ গ্রহণ করেছেন এবং অংশ গ্রহণ করা মাত্র দুঃস্বপ্নের কবলে পরে ঘুম ভেঙ্গে জেগে গেল। কারো ঘুম ভাঙ্গল বিকট শব্দে আর চিৎকারে।
তবে যার ঘুম যেভাবে-ই ভাঙ্গুক। প্রথমেই সবার মনে যে কৌতুহল জাগল তা হল “কিসের শব্দ!”
আর যখন বুঝতে পারল কিসের শব্দ, সাথে সাথে কৌতুহল মিটে গেল। সেখানে জন্ম নিল প্রচন্ড ভয়। গুলি এবং চিৎকারের শব্দে শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায় সবার। গ্রামে মিলিটারী ঢুকেছে। পৈতৃক প্রাণটা বুঝি এবার গেল! স্বোনার সংসারের এখানেই ইতি। এই এই ছোট্ট শিশুটাকেও কি মেরে ফেলবে। শুনেছি নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকেই নাকি এরা ছাড়ে না। পাশের বাড়ির নতুন বউটার কী হবে! আজই না ওর বিয়ে হলো। ঐতো তার শাশুড়ীর চিৎকার শুনা যাচ্ছে। নাকী-কান্নার সাথে চিৎকার করে কী বলছে সে, তার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আজ বিকেলেই তো আসাদ নীলাকে প্রেম পত্র দিয়ে এলো। মাত্র দুই বাড়ী পরে নীলাদের বাড়ী। রোজই দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে তার পরও তারা পরস্পর চিঠি চালাচালি করে যাচ্ছে। কিন্তু নীলা এখন কী করছে? আসাদ কী নীলার খোঁজ নিতে আসবে? ওকি! ওকি! আবার বৃষ্টি শুরু হলো যে।
অপু প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। ঘুম ভেঙে চিৎকার-কান্না-গুলির শব্দে ভয়ে তার বুক ধরফর করছে। সে দৌড়ে এসে নীলা আপার ঘরে ঢুকল। একি! আপা কোথায়? আপা কোথায় গেল? অপু আর কিছু ভাবতে পারল না। তাড়াতাড়ি সে বাবা-মার ঘরের দিকে ছুট দিল।
বাবা-মার ঘরে এসে দেখে নীলা আপাকে জড়িয়ে ধরে মা খাটের উপর বসে আছে। ভয়ে আপার শরীর ঠকঠক করে কাপছে। আপার জন্য অপুর বড় মায়া হল।
আর বাবা মেঝেতে দাড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে দিশেহারা ভাব। যেন কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। বাবার জন্যেও অপুর বড় মায়া হল।
চিৎকার গুলির শব্দ তখনো থামেনি। তার সাথে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে ঝড়-বৃষ্টি। সব মিলিয়ে কোনটা বজ্রপাতের শব্দ আর কোনটা শেল ফাটার শব্দ তা আলাদা করে বুঝা মুশকিল। শব্দ যে হারে বাড়ছে মনে হচ্ছে তাদরে বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে।
হঠাৎ অপু কোন কিছু চিন্তা-ভাবনা না করেই খাটের নিচে ঢুকে গেল। খাটের নিচে ঢুকে অপু মোটামুটি নিশ্চিত বোধ করল। ছোট বেলায় সে কোন কারণে ভয় পেলে বা মার পিটুনির হাত থেকে বাঁচতে খাটের নিচে লুকাত। তবে আজ কেন সেই কাজ পুনঃরায় করল তা জানে না। বিশেষ করে এই প্রকার আত্মরক্ষা স্কুলে পড়ার পর থেকে আর করা হয়নি।
অপু এখন খাটে নিচে বসে প্রায় কিছুই দেখছে না। লন্ঠনের আবছা আলোয় শুধু বাবার পা দু’খানি দেখতে পাচ্ছে। অপু দেখতে পাচ্ছে বাবার পা জোড়া এখন রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছে। রান্না ঘরের জানালা বন্ধ করার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তারপর আপার ঘরের দরজা-জানালা এবং অন্যান্য ঘরের সব ক’টি দরজা-জানালা বন্ধ হল। বাবার পা দু’খানি অপু আবার দেখতে পেল, এবার লন্ঠনের দিকে এগিয়ে গেল। আলো নিভিয়ে দেওয়া হল।
আলো নিভিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে চারদিক অন্ধকারে ডুবে গেল। খাটের নিচে অপু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তার নিজেকে খুব একা মনে হল। অপু আন্দাজ করার চেষ্টা করল বাবা, মা এবং আপা কোথায় কি করছে।
বাবা ফিশফিশ করে কি বলতেই খাটের উপর নাড়াচাড়ার শব্দ পাওয়া গেল। কেউ খাট থেকে নেমে যাচ্ছে। আরপার আরো একজন নামলো। সম্ভবত প্রথমে মা পরে আপা।
অপুর হঠাৎ মনে হল- “সেকি! তারা কোথায় যাচ্ছে ? সে যে খাটের নিচে আছে বাবা-মা কী তাকে দেখেনি। যদি কোথাও যায় তাকে ঢাকছে না কেন?” অপু কি করবে বুঝতে পারছে না।
এমন সময় দেখলো অন্ধকারে তিনটে ছাড়া মূর্তি হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নিচে ঢুকছে। কে যেন অন্ধকারে অপুকে বুকে টেনে নিল। কে তা বুঝতে পারল না তবে এই গন্ধ অপুর পরিচিত। এটি তার মায়ের গন্ধ। অপু মায়ের গলা জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। অপু মনে মনে বলল-“আর ভয় নেই!”
অপুদের গোটা পরিবার খাটের
নিচে বসে অপেক্ষা করছে কখন ভোর হবে।
তারা কী দেখতে পারবে ভোরের আলো?
সমাপ্ত