Monday, February 22, 2016

জুলাই মাস, ১৯৭১। ময়মনসিংহের ধানিখোলো গ্রাম। রাত প্রায় দু’টার কাছিকাছি। রহমান মিয়া ঘুমানোর জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। এমন সময় দরজায় টোকার শব্দে সে খুবই অবাক হল। এতো রাতে আবার কে এলো। এমনিতেই দেশের অবস্থা খারাপ। তাদের পাশের গ্রামে মেলেটারী ক্যাম্প ফেলেছে। গ্রামবাসী সবাই আছে ভয়াভহ অতঙ্কে। মেলেটারী এখন তো তখন আসে অবস্থা।

ভয়ে ভয়ে রহমান মিয়া দরজা খুলে দেখে তার সামনে তিনজন লোক দাড়িয়ে আছে। একজনের কাধে রাইফেল। অন্য দু’জনের হাতে লাঠিমত কিছু আছে। রাইফেলধারী লোকটি লুঙ্গি এবং হাফহাতা নীল রঙের সার্ট পড়ে আছে। গায়ের রং ফর্সা, লম্বা, খোচা-খোচা দাড়ি এবং মাথার চুল উসকোখুসকো। চোখে মনে হয় চোক চোকে একটা ভাব আছে। অন্য দু’জনকে ভালোমত দেখা যাচ্ছে না। তবে তাদের চোখের চাহনিতে ক্ষুদার্থ কুরের সাথে কোথায় যেন একটা মিল আছে।

রহমান মিয়ার কাছে তাদের ভাবসাব সুবিধার বলে মনে হলো না। বিশেষ করে কুকুর চাহনি লোক দুটিকে। সামনের জনকে লীডার বলে মনে হচ্ছে। রহমানের মনে হচ্ছে রাইফেলধারী আদেশ দিলে পিছনের দুইজন তার উপর কুকুরের মত হামলে পড়ে ছিড়েফুড়ে খেয়ে ফেলবে।

রহমান রাইফেলধারী লোকটির দিকে ভূরু কুচকে তাকালো। (যার অর্থ- কি চাই?)

রাইফেলধারী তাকে প্রথমেই বলল- ‘আসসালামুআলাইকুম’।

রহমান কিছু বললো না।

রাইফেলধারী বলল- ‘ভাই আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমি হামিদ এরা আমার সঙ্গী এহলো আজগর আর পাশের জন কেরামত।

জবাবে রহমান বলল- ‘ও আচ্ছা’।

হামিদ বলল- ‘ভাই আমরা পাশের গ্রামে একটি অপারেশনে অংশ নিতে আসছি। অপারেশন শুরু হবে ভোর বেলার কিছু আগে। যদি কিছু মনে না করেন আমরা আপনার এখানে কিছুক্ষন বিশ্রাম করতে চাই। আর আমাদের জন্য চারটা ভাতের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হয়। আমরা সবাই প্রায় সারাদিন কিছুই খাইনি।’

রহমান বলল- ‘আসেন আসেন। কোন সমস্যা নাই। আপনারা বিশ্রাম করেন আমি আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছি।

রহমানের একটি মাত্র ঘর। নতুন বিয়ে করেছে। তার স্ত্রীর নাম ‘‘জরিনা’’। মাত্র ছয় মাসরে মত হল তাদের বিয়ে হয়েছে। বিয়ের দুই মাসের মাথায় দেশে শুরু হল গোন্ডগোল। এসব যুদ্ধ-গোন্ডগোল নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। যদি না গত মাসে তাদের পাশের গ্রামের স্কুল ঘরে মেলেটারী ক্যাম্প ফেলতো। বর্তমানে পুরো গ্রামবাসী আতঙ্কে আছে।

হামিদ রহমান এবং কেরামত-কে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। রহমান জরিনাকে কানেকানে কি বলতেই সে ঘর থেকে হয়ে গেল। হামিদ এবং কেরামত জরিনার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। যাতক্ষন না সে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ততক্ষন তাকিয়েই রইল।

রহমান লক্ষ্য করল তাদের ‍দিষ্টি এখনো কুকুরের মতই। জরিনার শরীর দু’জন এমনভাবে লক্ষ্য করছিল যেন- তাদের গোলায় কোন শিকল বাধা আছে, ছাড়া পেলেই জড়িনার উপর ঝাপিয়ে পড়বে অবস্থা। হামিদ সম্পূর্ণ নির্বিকার। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। রহমান মিয়া খুবই ভয় এবং অসস্তি বোধ করছে। সে মনে মনে এই ভেবে নিজেকে আসস্ত্য করল-‘‘আরে দূর ভয়ের কি আছে। এরা হইল মুক্তিযোদ্ধা, বাঙলার দামাল ছেলে। এরা পাকিস্তানীগো লগে যেমনে ফাইট দিতাছে দেশ স্বাধীন হইতে বেশিদিন লাগবো না। খামাখা ভয় পাইতাছি।’’

পাশে রান্না ঘরে জরিনা রান্না চাপাচ্ছে। হাড়ি পাতিলের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

ঘড়ে অস্বস্তি নিয়ে সবাই বসে আছে। হামিদ রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘ভাই আপনার নামটি তো জানা হল না।’

জবাবে রহমান বলল- ‘ও আচ্ছ, আমার নাম আবদুর রহমান মিয়া। এলাকায় সবাই রহমান মাস্টার বইলা চিনে।’

হামিদ বলল- ‘কি করেন আপনি? মাস্টার বললেন যে? শিক্ষক নাকি?’

‘জি। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। তাছাড়া আমার কিছু ধানি জমি আছে তাই চাষ-বাস করি। দু’জন মানুষ চলে যায় কোন রকমে।’

‘আর ঐ মহিলা আপনার স্ত্রী তো, নাকি?

‘জি। আমার স্ত্রী। আমার পরিবারের নাম জরিনা বিবি। বড়ই ভালো মেয়ে।’

‘কোন ছেলে-মেয়ে নাই?’

‘জি-না। মাস সাতেক হলো আমাদের বিবাহ হয়েছে। তবে এখন আমার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা।’

‘তাই নাকি! এতো খুবই ভালো সংবাদ।’

রহমান খুবই লজ্জা পেল। তবে মুখে বলল- ‘দোয়া রাইখেন।’

কথা-বার্তা যা হচ্ছে হামিদ এবং রহমানের মধ্যেই হচ্ছে। তাদের কথাতে আজগর কেরামতের কোন আগ্রহ দেখা গেল না। আজগর কেরামত নীচু গলায় ফিসফিস করছে। যেন কোন ষড়যন্ত্র করছে এমন ভাব তাদের মধ্যে। মাঝে মাঝে দু’জনই কানপেতে জরিনার হাড়ি-পাতিলের শব্দ শুনছে।

রহমত ভাবলো তাদের হয়তো খুবই ক্ষুদা লেগেছে। হাড়ি-পাতিলের শব্দ শুনে আন্দাজ করার চেষ্টা করছে রান্না কতদূর এগোল।এরই মধ্যে রহমানের ভয় দূর হয়ে গেছে হামিদের বন্ধুত্যপূর্ণ ব্যবহারে। রান্না যাতে দ্রুত শেষ হয় এই উদ্দেশ্যে রহমান পাকের ঘরে গেল জরিনাকে সাহায্যের জন্য।




হামিদ কেরামত আর আজগর গোগ্রাসে ভাত খাচ্ছে। যেন কত দিন খায়নি। রহমান তাদের খাওয়া খুবই আগ্রহ নিয়ে দেখছে। খাওয়ার আয়োজন সামান্য। হাঁসের ডিম ভূনা এবং ডাল। তাই তারা তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে।



হামিদ বলল-‘ভাবীর হাতের রান্না ভালো! অনেক দিন পর এমন স্বাদের রান্না খেলাম। ডালটা অসাধারণ হয়েছে।

রহমানের বড়ই মায়া লাগলো। মনে মনে বলল-‘‘আহা! বেচারাদের যদি মাংস রান্না করে খাওয়ানো যেত।’’ তবে মুখে বলল-‘ভাই গরীব মানুষ তেমন ভালো-মন্দ খাওয়াতে পালাম না। আবার যদি আসেন তাপনেগো লাইগা ভালো রান্নার আয়োজন করা হবে।’

হামিদ বলল-‘অবশ্যই। আবার আসলে ভাবীর রান্না খেয়ে যাব।’

খাওয়া শেষে সবাই উঠে দাড়ালো। জরিনা গামছা এসে দিল হাত মোছার জন্য। হামিদ গামছা নিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল- ‘রহমান ভাই আজ আমাদের যেতে হচ্ছে। সময়তো হয়ে গেছে। আপনার এ উপকার চিরদিন মনে থাকবে।’

রহমান লজ্জিত মুখে বলল- ‘ভাই কিছুই করতে পারলাম না। গরিবের এই দোষ নিজ গুনে ক্ষমা করবেন।’

হামিদ বলল- ‘কি যে বলেন। ছি ছি।’ এই বলে সে রাইফেল কাধে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা ধরল। রহমানও পিছু নিল হামিদকে এগিয়ে দিতে। কেরামত ও আজগর রহমানের পিছনে আছে। দরজার সামনে গিয়ে হামিদ হঠাঘুরে দাড়ালো। রহমান ভেবেছিল হামিদ বোধহয় তাকে কিছু বলবে। কিন্তু সে লক্ষ্য করল হামিদ তার পিছনে কেরামত ও আগজরের দিকে তাকিয়ে আছে।

হামিদ ও কেরামতের চোখে চোখে কিছু কথা হল। এক মুহূর্ত মাত্র তারপরই রহমানের মাথায় প্রচন্ড এক বাড়ী পরল।

জরিনা চিকার দিল- ‘আল্লা........।’ তার চিকার মাঝামাঝি থেমে গেল। কারণ আজগর তাকে হাতে ঝাপটে ধরে অন্য হাতে মুখ চেপে ধরল। রহমান জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পরে গেল। জরিনা তার সর্ব শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো। এক পরযায়ে আজগরের সাহায্যে হামিদ এবং কেরামত এগিয়ে এলো। এবার জরিনা ভয় পেল। তার সাথে কি হতে যাচ্ছে কল্পনা করতে হাত-পা হিম হয়ে এলো। প্রচন্ড ভয়ে জরিনা জ্ঞান হারালো।

সম্পূর্ণ ঘটনাটা ঘটতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ সেকেন্ডের মত। হামিদ ও কেরামত আগে এবং আজগর জরিনাকে কাধে ঝুলিয়ে তারা রহমানের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। হামিদ চারপাশে ভালো করে দেখে নিল। গ্রাম অঞ্চলে সাধারণত ঘর-বাড়ি গুলো একটু দূরে দূরে অবস্থান করে। এক বাড়িতে কী হচ্ছে তা আরেক বাড়ির মানুষ জানতেও পারে না। গ্রামবাসী সবাই গভীর ঘুমে তোলিয়ে আছে।

হামিদের দূর দৃষ্টি খুবই ভাল। সে স্পষ্ট কল্পনা করতে পারছে যখন রহমানের জ্ঞান ফিরে আসবে তখন দেখতে পাবে না তার স্ত্রী ও হামিদেরকে। তখন ঘটনাটা বুঝতে তার বাকী রইবে না জরিনার কপালে কি ঘটেছে। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে মুক্তি বাহিনী এই কাজ করতে পারে। আর অবিশ্বাসই বা করবে কেন? হা হা হা। তারা প্ল্যান মাফিক কাজ করতে পেরেছে। রহমানের মনে বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে তারা মুক্তি বাহিনীর লোক। সকালে যখন গ্রামের মানুষ ঘটনা জানবে তখন তাদের মনের কি অবস্থা হবে তাই ভেবে তার আনন্দ হচ্ছে। পরবর্তীতে কোন মুক্তি সেনা এলে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কোন প্রকার সাহায্য তারা পাবে না। ইতিহাসে লেখা থাকবে মুক্তি বাহিনীরা সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার, দর্ষণ, লুট-তরাজ চালিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে হামিদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ আজগর এবং কেরামতও হামিদের সাথে গলা মেলালো।


-সমাপ্ত-

No comments :

Post a Comment